August 31, 2026, 9:39 am

ড. আমানুর আমান
মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে মক্কা শুধু একটি পবিত্র নগরীর নাম নয়, বহু শতাব্দী ধরে এটি মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, আবেগ ও আত্মপরিচয়েরও প্রতীক। সেই মক্কাতেই সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের ঘটনা তাই কেবল আরেকটি সামরিক সমঝোতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক, অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বাজার এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর নতুন কৌশলগত হিসাব।
গত ৭ আগস্ট সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ যে চুক্তিতে সই করেছেন, তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—চুক্তিভুক্ত কোনো একটি দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি। এই জায়গাটিই চুক্তিটিকে সাধারণ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বাইরে নিয়ে গিয়ে একটি সম্ভাব্য সামরিক জোটের চরিত্র দিচ্ছে। সে কারণেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কেউ কেউ এটিকে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বলছেন।
তবে এখানেই একটু থামা দরকার। ন্যাটোর সঙ্গে তুলনা যতটা আকর্ষণীয়, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। ন্যাটোর রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সমন্বিত কমান্ড ব্যবস্থা ও সুস্পষ্ট সামরিক প্রক্রিয়া। মক্কা চুক্তি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তা ভবিষ্যৎই বলবে। বরং এটিকে আপাতত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার একটি নতুন কাঠামো হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
এই জোটের তিন সদস্যের শক্তির ধরনও ভিন্ন। সৌদি আরবের হাতে রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য, জ্বালানি সম্পদ এবং মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান। তুরস্কের বড় শক্তি তার সামরিক শিল্প ও প্রযুক্তি। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, নৌ সক্ষমতা, সেন্সর ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে দেশটি গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা তৈরি করেছে। আর পাকিস্তান নিয়ে এসেছে বড় পেশাদার সেনাবাহিনী, সামরিক অবকাঠামো, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। অর্থাৎ অর্থ, প্রযুক্তি ও সামরিক শক্তি—তিন ধরনের সক্ষমতার একটি সমন্বয় এই জোটে দেখা যাচ্ছে।
এই জায়গা থেকেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ এখনো এই চুক্তির সদস্য নয়। জাতীয় সংসদে প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, বাংলাদেশকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তবে তিনি চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা বলেছেন। অর্থাৎ দরজা এখনো খোলেনি, কিন্তু দরজার দিকে বাংলাদেশের দৃষ্টি আছে—এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা অন্তত পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ কেন আগ্রহী হতে পারে, তার পেছনে বাস্তব কিছু কারণ রয়েছে। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তার মধ্যে অন্যতম। আধুনিক যুদ্ধ এখন শুধু সৈন্য, ট্যাংক কিংবা যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করে না; ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, স্যাটেলাইট নজরদারি, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও তথ্য বিশ্লেষণ ক্রমেই সামরিক সক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসছে। তুরস্ক এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে। জোটের কাঠামোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশ শুধু অস্ত্র কেনার সুযোগ নয়, প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা কিংবা প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগও পেতে পারে।
তবে এখানেও বাস্তবতার জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলেই উন্নত প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায় না। কী প্রযুক্তি দেওয়া হবে, কী শর্তে দেওয়া হবে, বাংলাদেশ কতটা প্রযুক্তি নিজ দেশে উৎপাদন বা ব্যবহার করতে পারবে—এসব নির্ভর করবে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চুক্তির ওপর। তাই সম্ভাবনাকে নিশ্চিত প্রাপ্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আরেকটি বড় বিষয় সমুদ্রপথ। বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই সমুদ্রনির্ভর। বঙ্গোপসাগর পেরিয়ে ভারত মহাসাগর, সেখান থেকে আরব সাগর হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ। জ্বালানি আমদানি থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন—এই সমুদ্রপথ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সৌদি আরবের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়লে এই বিস্তৃত সামুদ্রিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত যোগাযোগ ও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি বাস্তব মাত্রা রয়েছে। দেশটিতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন এবং তাদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সৌদি আরব দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগীও। ফলে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা যদি অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিনিয়োগ, শ্রমবাজার ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও নতুন দরজা খুলতে পারে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো দরজাই একমুখী নয়। যে দরজা দিয়ে সম্ভাবনা আসে, সেই দরজা দিয়েই ঝুঁকিও ঢুকতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বাংলাদেশের সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার নীতিগত অবস্থান নিয়ে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোটের সদস্য হয়নি। বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও ঢাকা সাধারণত নিজের কূটনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দেওয়া হলে সেই অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটবে।
কারণ প্রতিরক্ষা জোট মানে শুধু শান্তিকালীন প্রশিক্ষণ কিংবা অস্ত্র সহযোগিতা নয়। সংকটের সময় মিত্রদেশের পাশে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রত্যাশাও তৈরি হয়। মক্কা চুক্তির কোনো একটি সদস্য আক্রান্ত হলে সেটিকে অন্য সদস্যদের ওপরও হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি যদি কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের বাইরে কোনো সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার চাপ তৈরি হতে পারে।
আর এখানেই এসে যায় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের বিষয়টি।
বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারত। আবার মক্কা জোটের অন্যতম সদস্য পাকিস্তান। ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কের ইতিহাস দীর্ঘ সংঘাত ও অবিশ্বাসে পূর্ণ। ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি হলে মক্কা জোট কী অবস্থান নেবে—এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যদি তখন জোটের সদস্য থাকে, তার ওপরও কোনো না কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা কৌশলগত চাপ তৈরি হতে পারে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে জোটে পাকিস্তান থাকলেই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এত সরল সমীকরণে চলে না। বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক দক্ষতা দিয়ে ভারত, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—সবার সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য, সামরিক জোটে প্রবেশ করলে সেই ভারসাম্য বজায় রাখার কাজ আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই মক্কা জোটের প্রশ্নটি আবেগের নয়, হিসাবের। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের বাস্তবতা। কিন্তু রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয় জাতীয় স্বার্থ দিয়ে। সেখানে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা, জ্বালানি, সমুদ্রপথ, প্রতিবেশী সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক স্বাধীনতা—সবকিছুর হিসাব একসঙ্গে করতে হয়।
এই কারণে বাংলাদেশকে আগে জানতে হবে, মক্কা জোট আসলে কোথায় যেতে চায়। এটি কি সীমিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামো থাকবে, নাকি ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে পরিণত হবে? সদস্যদের ওপর প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা কতটা কঠোর হবে? কোনো সদস্যের আঞ্চলিক সংঘাত কি অন্য সদস্যদের সামরিকভাবে যুক্ত করবে? জোটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া কী হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সদস্যপদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের সামনে তাই একদিকে রয়েছে আধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে গভীরতর সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুবিধার দরজা। অন্যদিকে রয়েছে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা, ভারত-পাকিস্তান সমীকরণের চাপ এবং দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা।
শেষ পর্যন্ত মক্কা জোট বাংলাদেশের জন্য সুযোগ না ঝুঁকি—এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। বরং জোটটি কীভাবে বিকশিত হয় এবং বাংলাদেশ কী শর্তে যুক্ত হয়, তার ওপরই অনেক কিছু নির্ভর করবে। আমন্ত্রণ এলে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন ঠিক হবে না, তেমনি সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণে আগেভাগেই দরজা বন্ধ করাও বিচক্ষণতা হবে না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার কূটনৈতিক ভারসাম্য। সেই ভারসাম্য অক্ষুণ্ন রেখে যদি প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তায় বাস্তব সুবিধা আদায় করা যায়, তবে মক্কা জোট বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হতে পারে। আর যদি সদস্যপদের বিনিময়ে কূটনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয় কিংবা অন্যের সংঘাতের দায় বাংলাদেশকেও বহন করতে হয়, তাহলে একই জোট নতুন নিরাপত্তা সমস্যার উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ মক্কা জোটে যাবে কি না’—এখানে আটকে থাকার নয়। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এমনভাবে যাবে, যাতে জোটের শক্তি কাজে লাগানো যায়, কিন্তু জোটের সংঘাতের ভার নিজের কাঁধে নিতে না হয়? সেই উত্তর খুঁজতেই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গভীর কূটনৈতিক পর্যালোচনা, জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এবং প্রতিটি সম্ভাব্য লাভ-ক্ষতির নির্মোহ হিসাব।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক, প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস।